কুরআন ও হাদীছ অধ্যয়নের ফলে মানুষের বিবেকের মধ্যে যে, নূর অর্জিত হয়। উহার মাধ্যমে সংক্ষিপ্তভাবে মানুষের অবস্থা অনুধাবন করা যায়। সে নেককার না। বদকার ইহার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু ইহার দ্বারা কোন ব্যক্তি বিশেষের অবস্থার কথা জানা যায় না। এই জন্য আমরা ব্যাহিকভাবে (উদাহরণ স্বরূপ) যায়দ বা আমরের ঈমানের উপর নির্ভর করিয়া থাকি। কিন্তু কি অবস্থায় তাহার মৃত্যু হইবে। তাহার শেষ পরিনতি কি হইবে- তাহা বলিতে পারি না।

যদিও বাহ্যতঃ তাহাকে নেককার বলিয়া তাহার প্রতি সুধারণা রাখি- কিন্তু তাহার শেষ পরিনতি সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ। কারণ তাকওয়া- পরহেজগারীর প্রকৃত স্থান হইল অন্তর। ইহা সুক্ষ বিষয় যে তাকওয়া অবলম্বনকারী নিজেও তাহার অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। সুতরাং অন্যরা কি করিয়া তাহাকে মুত্তাকী বলিতে পারিবে? কেননা কাহারও আভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া ব্যতীত তাহার সম্পর্কে সঠিক কিছু বলা যায় না, মানুষ মরিয়া যাওয়ার ফলে পার্থিব জগত হইতে গায়েব জগতে এবং ফিরিশতা লােকে গমন করে। আর সেখানে চর্মচোখ বা জাগতিক চোখে কিছুই দেখা যায় না।

বরং আভ্যন্তরীণ এক চোখ দ্বারা দেখে। ইহা তাহার অন্তর চোখ। ইহার জন্ম অন্তরে। কিন্তু মানুষ কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ এবং নিজেদের বদআমলীর দ্বারা ইহার। উপর খুব শক্ত পর্দা ফেলিয়া রাখিয়াছে। এইজন্য এই চক্ষুর মাধ্যমে কোন কিছু দেখিতে পায় না। যতক্ষন পর্যন্ত অন্তর চক্ষু হইতে এই পর্দা দূরীভূত না করিবে।

যেহেতু নবীগণের অন্তর চক্ষুর উপর এই পর্দা ছিল না তাই তাঁহারা ফিরিশতালােকের প্রতি নজর করিয়া এই জগতের বিস্ময়কর জিনিসসমূহ দেখিতে পাইতেন। অধিকন্তু মৃত ব্যক্তিরাও ফিরিশতা জগতে থাকে তাই নবীগণ তাহাদের অবস্থা অবলােকন করিয়া বর্ণনা করিতেন। এই জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাদ ইবনে মুআয (রাঃ) হযরত যয়নব (রাঃ) এর কবরের অবস্থা দেখিতে পাইয়াছিলেন যে, কবর তাহাদিগকে চাপ দিতেছে।

হ্যরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ওহুদের জিহাদে শহীদ হইয়া ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাবের (রাঃ) কে তাঁহার পিতার অবস্থা শুনাইতেছিলেন যে আল্লাহ পাক তাহাকে স্বীয় সামনে পর্দা ব্যাতীত বসাইলেন। উভয়ের মধ্যে কোন পর্দা ছিল না। একবারে সরাসরি সামনে বসাইয়াছিলেন। নবীগণ এবং যে সকল আওলিয়া কেরাম নবীগণের স্তরের কাছাকাছি পৌছিয়াছেনতাহাদের ছাড়া অন্য কেহ এই অবস্থা অবলােকন করিতে পারে না। তবে আমাদের মত লােকদের দ্বারা অন্য এক প্রকার দুর্বল অবলােকন হইতে পারে।

ইহাও নববী অবলােকন। ইহা হইল স্বপ্নে অবলােকন। স্বপ্নে অবলােকন নবুয়তের নূবের এক আলােকচ্ছটা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সত্য স্বপ্ন নবুয়তের ছিয়াল্লিশ অংশের একাংশ। স্বপ্নের মাধ্যমেও অনেক কিছুর হাকিকত খুলিয়া সামনে আসে। সত্যিকার তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় তখনই যখন অন্তরের উপর হইতে পর্দা সরিয়া পড়ে। এই জন্যই নেকচরিত্র সত্যানুসারী ব্যক্তির স্বপ্ন ব্যতীত অন্য কাহারও স্বপ্ন গ্রহণযােগ্য নহে। মিথ্যা স্বপ্ন সত্য হয় না।

যে ব্যক্তি বিভিন্ন ফাসাদী ও গােনাহের কাজে বেশী জড়িত তাহার অন্তর অন্ধকার হইয়া যায়। সুতরাং সে যাহা কিছু দেখিতে পাইৰে বিব্রত হইতে থাকিবে। এইজন্যই ওজু অবস্থায় শয়ন করিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়াছেন। যাহাতে পবিত্র অবস্থায় তাহার নিদ্রা হয়। প্রকারান্তে এই নির্দেশে বাতেনী পবিত্রতার দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। আর বাতেনী পবিত্রতাই প্রকৃত পবিত্রতা। বাহ্যিক পবিত্রতা তাে পবিত্রতার পূর্নতার পর্যায়ের জিনিস।

অন্তর যখন পরিস্কার হয় তখন অন্তর চক্ষুর। সামনে এমন সব জিনিস খুলিয়া আসে যাহা ভবিষ্যতে সংঘঠিত হইতে যাইতেছে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পুনরায় মক্কায় গমনের ব্যাপারটি তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে পূর্বেই জানিতে পারিয়া ছিলেন। এমনকি এই কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য আয়াতও অবতীর্ন হইয়াছে।

ت صدق الله رسوله الرؤيا پالحق

“আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলকে স্বপ্ন সত্য করিয়া দেখাইয়াছেন।” (সূরা ফা/ আয়াত ২৭)

স্বপ্ন সত্য হওয়া এবং স্বপ্নের মাধ্যমে অদৃশ্য জগতের অবস্থা সম্পর্কে অবগত। হওয়া আল্লাহ পাকের বিস্ময়কর কার্যের অন্তর্ভূক্ত এবং নশ্বর মানবের বিরল বিষয় সমূহের একটি অন্যতম বিষয়। ইহা ফিরিশতা জগতের উপর একটি উজ্জ্বল প্রমাণও বটে। মানুষ এই ব্যাপারে অসতর্ক। যেমন মানুষ অন্তরের সকল প্রকার বিস্ময়কর জিনিস এবং বিশ্বনিখিলের অদ্ভুত ও আশ্চর্য বিষয় সমূহের ব্যাপারে অসতর্ক। স্বপ্নের হাকিকত বর্ণনা করা ‘উলুমে মুকাশাফা’ নামক বিষয়ের একটি সূক্ষ্ম কথা। আমাদের এই বাহ্যিক জগতের সাথে ইহার আলােচনা হইতে পারে না।

ইহা একটি উদাহরণ বিশেষ। ইহার মাধ্যমে উদ্দেশ্য অনুধাবন করা যায়। অন্তর একটি আয়নার ন্যায়। আয়নাতে বিভিন্ন জিনিসের আকৃতি ও হাকিকত প্রতিফলিত হয়। জগতের সৃষ্টি লগ্ন হইতে শেষ পর্যন্ত যাহা কিছু হইবে বলিয়া আল্লাহ পাক নির্ধারণ করিয়াছেন এই সব কিছু একটি স্থানে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। ইহাকে কুরআনে পাকে কখনও ‘লৌহমাহফুজ’, কখনও ‘কিতাবুম মুবিন’ আবার কখনও ‘ইমামুম মুবিন’ বলা হইয়াছে। অর্থাৎ বিশ্বনিখিলে যাহা কিছু হইয়াছে আর হইবে- সব ইহাতে লিপিবদ্ধ ও প্রতিফলিত হইয়া রহিয়াছে। যদিও ইহাতে প্রতিফলিত আকৃতি সমূহ জাগতিক দুনিয়ার প্রতিফলিত আকৃতির ন্যায় নহে। আর এই ধারণা করা ঠিক নহে যে “লৌহমাহফুজ’ কাঠ দ্বারা বা লােহা দ্বারা বা হাঁড় দ্বারা প্রস্তুত কোন জিনিস।

অথবা ইহা কাগজ বা পাতা দ্বারা প্রস্তুত কোন পুস্তক বরং ইহার প্রতি বিশ্বাস রাখা প্রয়ােজন যে, আল্লাহ পাকের কিতাব সৃষ্টির কিতাবের পৃষ্ঠার ন্যায় নহে। আমরা জানি যে আল্লাহ পাকের সত্তা সৃষ্টির সত্তার ন্যায় নহে। আবার তাঁহার গুণাবলীও সৃষ্ট জীবের গুণাবলীর ন্যায় নহে। অনুরূপভাবে তাঁহার কিতাব ও কিতাবের পৃষ্ঠাগুলিও সৃষ্ট জীবের কিতাব ও কিতাবের পৃষ্ঠার ন্যায় নহে। লৌহ মাহফুজে কুরআন কিভাবে লিপিবদ্ধ আছে তাহা অনুধাবনের জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি বুঝিয়া লইলে বিষয়টি অনেক সহজ হইয়া যাইবে। যাহারা কুরআনে পাক হিফজ করিয়াছে তাহাদের অন্তর ও স্মৃতিতে কুরআনের শব্দ এবং বর্ণাবলী- লিপিবদ্ধ হইয়া থাকে।

হাফেজ যখন কুরআন পড়িতে থাকে তখন সে যেন দেখিয়া দেখিয়া কুরআন পড়িতে থাকে। অথচ তাহার অন্তরে ও স্মৃতিতে শতবার অনুসন্ধান করিয়া দেখিলেও একটি হরফ বা ইহার নিশানা পাওয়া যাইবে না। আল্লাহ পাকের সকল আদেশ নিষেধ এবং অনুমােদন অনুরূপভাবে লৌহমাহফুজে লিপিবদ্ধ ও প্রতিফলিত থাকে। লৌহমাহফুজও একটি আয়নার ন্যায়। ইহাতে সবকিছুর আকৃতি প্রতিফলিত আছে।

যদি একটি আয়নার সামনে অপর একটি আয়না রাখা হয় তাহা হইলে প্রথম আয়নাতে প্রতিফলিত আকৃতি অপর আয়নাতেও প্রতিফলিত হয়। তবে পারস্পরিক প্রতিফলনের জন্য শর্ত হইল উভয় আয়নার মধ্যে কোন পর্দা না থাকা। যেহেতু

আখেরাত অন্তর একটি আয়না, ইহাতে ইলমের আকৃতির প্রতিফলন ঘটে। আবার লৌহমাহফুজও একটি আয়না যাহাতে পূর্ব হইতেই ইলমের প্রতিফলন বিদ্যমান রহিয়াছে। অন্তর যখন কুপ্রবৃত্তি ও দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের চাহিদার উপর চলে তখন এই দুইয়ের মধ্যে পর্দা পড়িয়া যায়। এই জন্যই লৌহ মাহফুজ দর্শন করা এবং ইহাতে লিপিবদ্ধ বিষয় সমূহ অধ্যয়ন করা সম্ভব হয় না। যদি কখনও বায়ু প্রবাহ চালু হয়। আর উভয়ের মধ্যবর্তী পর্দা একটু সরিয়া যায়।

ফলে উভয়ে সরাসরি সামনা সামনি হইয়া যায় তখন ফিরিশতা জগতে রক্ষিত লৌহমাহফুজের মধ্য হইতে বিজলীর ন্যায় ইলমের ঝলক অন্তরের আয়নাতে প্রতিফলিত হয়। কখনও কখনও এই ঝলক স্থায়ী হয়। আবার কখনও কখনও খুব তাড়াতাড়ি মিটিয়া যায়। আর অধিকাংশক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় রূপই হইয়া থাকে। আর মানুষ যতক্ষন পর্যন্ত জাগরিত থাকে ততক্ষন পর্যন্ত পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে এই বাহ্যিক জগত হইতে। তাহার অন্তরে অনেক কিছু পেীছে। অন্তর এই গুলােতেই লিপ্ত থাকে। আর এই লিপ্ত থাকার কারণেই ফিরিশতাদের জগৎ উর্ধ্ব জগত আড়ে পড়িয়া যায়।

পক্ষান্তরে অন্তর যখন ঘুমন্ত হইয়া পড়ে। অন্তর ঘুমন্ত হইয়া পড়ার অর্থ হইল- পঞ্চইন্দ্রিয় যখন চুপচাপ হইয়া পড়ে। এবং ইহার অন্তর পর্যন্ত কোন কিছু না পৌছায় অধিকন্তু অন্তর যখন পঞ্চইন্দ্রিয় এবং বিভিন্ন ধ্যানধারনার প্রভাব হইতে অবসর পায়। তখন ইহা পরিষ্কার হইয়া পড়ে এবং ইহার ও লৌহমাহফুজের মধ্যে অবস্থিত পর্দাটি দূরীভূত হইয়া পড়ে। তখনই লৌহমাহফুজের মধ্যে অবস্থিত যে কোন জিনিস অন্তরে প্রতিফলিত হয়।

Continue……