পূর্ববর্তী আলেম ও বুযুর্গগণ শাসক শ্রেণীর অত্যাচারে ধৈর্য ধারণ করতেন।

সালেহ মুররী (রঃ) বলেন, ভিতর-বাইর উভয়ই যার দুরুস্ত ও বিশুদ্ধ নয়, তার উপর কোন বিপদ নেমে আসলে তাতে অবাক হবার কিছুই নাই। হযরত ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন, তুমি যদি কোন যালেম বাদশাহর নির্যাতনের শিকার হও তাহলে নিজের জন্য এবং বাদশাহর জন্যও দোআ, এসতেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনায় লিপ্ত হও। |

মালেক ইবনে দীনার (রঃ) বলেন, ‘তাউরাতে’ লিখিত আছে, আল্লাহপাক বলেন, বাদশাহ ও শাসকদের হৃদয় আমার হাতের মুঠায়। যে আমার আনুগত্য করে, শাসকদেরে আমি তার জন্য ‘রহমত’ করে দিই। আর যে আমার অবাধ্য হয়, নাফরমানী করে, তার জন্য করে দিই কঠোরণ। অতএব, তােমরা শাসকদের ভৎসনা করে না বরং যে বাদশাহ তোমাদের প্রতি সর্বাপেক্ষা দয়াবান। সেই মহান আল্লাহ্র নিকট তওবা করে নানা থেকে ফিরে আসাে। | আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার প্রজাদের লক্ষ্য করে বলতেন, “ভাই সব, তােমরা নিজেদের সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ বলে প্রমাণ কর। তােমরা আমাদের কাছে হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমর (রাঃ)-এর মত আচরণ প্রত্যাশা কর, অথচ নিজেরা তাদের প্রজাদের মত প্ৰজা হতে চাওনা। আল্লাহর দরবারে আবেদন। জানাই, তিনি যেন আমাদের সবাইকে পরস্পরের প্রতি সাহায্য-সহযােগিতাকারী ও সহানুভূতিশীল করেন। |

বর্ণিত আছে, হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) যখন খলীফা নিযুক্ত হন, তখন অঝোর ধারায় কাঁদতে আরম্ভ করেন। স্বীয় স্ত্রী ও বাঁদীদের ডেকে বললেন, তােমরা যদি আমার নিকট থাকতে চাও তবে থাকতে পার, আর যনি চলে যেতে চাও তবে চলেও যেতে পার। কারণ, আমার উপর এমন এক কঠিন ও ভারী দায়িত্ব অপত হয়েছে হাদ্দীন তোমাদের খোজ-খবর নেওয়ার মত সুযােগ আমার হয়ে। আমি ততক্ষণ অবধি তােমাদের প্রয়ােজনে সাড়া দেবার মত অবসর পাবাে না। যতক্ষণ না সমন্ত জনগণ কিয়ামত দিবসের হিসাব-নিকাশ থেকে অবসর লাভ করেন।

খলীফার এ হৃদয়বিদারক বাণী শ্রবণে ঘরের ভিতর কান্নার রােল পড়ে যায়। পরিস্থিতির তীব্রতায় প্রতিবেশীদের মধ্যে এ ধারণা জন্মায় যে, নিশ্চয়ই এ বাড়িতে কারাে মৃত্যু ঘটে থাকবে।

সুফিয়ান ছাওরী (রঃ) বলেন, আমরা এমন আলেমগণকে দেখতে পেয়েছি যে, নিজ নিজ গৃহে অবস্থানই ছিলাে যাদের পছন্দনীয়। আর আজকের আলেমদের দেখতে পাচ্ছি রাজদরবারের মন্ত্রী ও যালেম শ্রেণীর দারােয়ান! ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহু (রঃ) বলেন, বাদশাহ যখন অত্যাচার-অবিচার আরম্ভ করে, আল্লাহুও তখন। তার রাজ্যে সমূহ বিপর্যয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেন। ফলে ক্ষেত-যিরাত, ব্যবসাবাণিজ্য, বাগ-বাগিচা সব কিছুতেই অভাব, ঘাটতি ও পতন দেখা দিতে থাকে।

সুফিয়ান ছাওরী (রঃ) বলেন, যে-ব্যক্তি কোন আলেমের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মুখে। সাক্ষাত করে, তাকে স্বীয় মজলিসে জায়গা দেয় কিংবা তার দেওয়া হাদিয়া-তােহফা। গ্রহণ করে, বস্তুতঃ সে ইসলামেরই শিকল ছিন্ন করে দিলাে। সে যালেমের সাহায্যকারী দলভুক্ত।

এখানে শিকল’ দ্বারা বুযুর্গানে-দ্বীনের অলংঘনীয় জীবন-পদ্ধতিকে বুঝানাে হয়েছে।

হ্যরত তৃাউস (রঃ) অধিকাংশ সময় নিজের বাসগৃহেই অবস্থান করতেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, শাসক শ্রেণীর যুলুম-সীমালংঘন, প্রজাকুলের অধঃপতন এবং সুন্নাহর মরণের পরিণামে আমাকে এ পথ বেছে নিতে হয়েছে। বিখ্যাত তাবেঈ আকুল আলিয়াহ্ (রঃ) একদা বাদশাহ হারুনুর রশীদের দরবারে গিয়ে তাকে এ-উপদেশ দান করলেন যে, মালুমের বন্দু-দোআর ভয় করতে থাক। কারণ, মযলুমের বদ্-দোআ রদু হয়না, তা সে ফাসেক, বদকার কিংবা কাফেরই হােকনা কেন।

হে বন্ধু! তুমি নির্জন গৃহাভ্যন্তরে তােমার অধীনস্থ প্ৰজা-প্রতিবেশীদের তথা তােমার দেহ-মন ও অংগ-প্রত্যঙ্গের অধিকার পূরণ করেছ কিনা, গভীর ভাবে তা ভেবে দেখ। অঙ্গ সমূহকে খােদার সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করেছ,না-কি নাফরমানীতে লিপ্ত করে দেহ, জীবন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রাপ্য হক খর্ব ও ধ্বংস করেছ? কারণ, প্রত্যেক মানুষকে স্ব স্ব রাজত্ব ও রাজত্বাধীন প্রজাদের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

হে বন্ধু! আমীর ও শাসকদের কাছে তুমি যেওনা; উপদেশ দানের উদ্দেশ্যেও না। কারণ, উপদেশ দানে তুমি ব্যর্থকাম ও অকৃতকার্য হবে। (ই, নিজে শরীআতের সীমার মধ্যে থেকে সুযোগ হলে তাতে বাধা নেই। কিন্তু, সমস্যা হলাে, সাধারণতঃ এসবকিছুই পৰোয়৷ করা হয় না। স্বার্থ বা সম্মানের। মােহে দ্বীন ও খােদাভীতি সবকিছুই ভুলে যাওয়া হয়।